রবিবার, ২১ Jun ২০২৬, ০৮:০১ পূর্বাহ্ন
নেত্রকোণার আলো ডটকম ডেস্ক:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে রাজস্ব আদায়ে গতি আনার জন্য একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পতিত সরকারের শেষ মাসে অর্থাৎ জুলাইয়ে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ছিল, কিন্তু এর পরবর্তী সময়ে, বিশেষত আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত, পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি লাভ করেছে। তবে, লক্ষ্য অর্জনে ২৩ শতাংশেরও বেশি ঘাটতি রয়ে গেছে, যা এনবিআরের সামনে বড় একটি চ্যালেঞ্জ। বর্তমান সরকার এবং এনবিআর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সংস্কার ও আধুনিকীকরণের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া উন্নত করার জন্য কাজ করছে।
পতিত সরকারের সময় অর্থাৎ জুলাইয়ে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.১২ শতাংশ ঋণাত্মক, যা গত বছরের তুলনায় কম ছিল। পরে আগস্ট মাসে, যা সরকারের পতনের পরবর্তী মাস ছিল, রাজস্ব আদায় কমে গিয়ে ২১ হাজার ৬২৯ কোটি টাকায় নেমে আসে—যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪.৩৪ শতাংশ কম ছিল। তবে, সেপ্টেম্বরে রাজস্ব আদায় ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায় এবং ২ শতাংশ ধনাত্মক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রায় কিছুটা অগ্রগতি সৃষ্টি করে।
অক্টোবর মাসে, এনবিআর রাজস্ব আদায়ে ৮.৬৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়। অক্টোবর মাসে রাজস্ব আদায় ৩০ হাজার কোটি টাকার ওপরে চলে যায় এবং মোট চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) রাজস্ব আদায় দাঁড়ায় ১ লাখ ১ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকায়।
এনবিআরের চেয়ারম্যান মো: আব্দুর রহমান খান জানিয়েছেন, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা বর্তমান পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জিং হলেও সরকার এবং এনবিআর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে। তিনি রাজস্ব প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার জন্য অটোমেশন এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন। এনবিআর ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে:
এনবিআর রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ এবং দ্রুতগতির করার জন্য অটোমেশন চালু করছে। আয়কর, ভ্যাট, কাস্টমস—এই তিনটি খাতে বিশেষভাবে ডিজিটালাইজেশন এবং অটোমেশন ব্যবস্থা উন্নত করা হচ্ছে।
রাজস্ব আদায়ের বিধি ও প্রক্রিয়ায় ব্যাপক সংস্কার চলছে। এনবিআর ভ্যাট, কাস্টমস, ও আয়কর আইনকে আরও সেবাবান্ধব এবং ব্যবসাবান্ধব করতে পরিবর্তন আনার জন্য তিনটি পৃথক কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটিগুলির মাধ্যমে আইন সংশোধন এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এনবিআর নতুন পদক্ষেপের মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধ করতে চায়। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে কর ফাঁকি উদঘাটন করছে। সিআইসি চলতি বছরের ১৬৭টি মামলার মধ্যে ৭৪ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। এছাড়া, ব্যাংক ফ্রিজের মাধ্যমে করফাঁকির বেশ কিছু মামলার সমাধান করা হয়েছে।
এনবিআর দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। যেসব কর্মকর্তারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দুর্নীতির শিকার কিছু করদাতাকে গুরুতর শাস্তি দেওয়া হয়েছে এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ন আয়কর মামলাও তদন্তাধীন রয়েছে।
জনগণের জন্য দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যেমন, পেঁয়াজ, আলু, চিনি, চাল ইত্যাদি পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দাম নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, যাতে জনগণের ওপর চাপ কমে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা আসে।
এনবিআর স্বর্ণ চোরাচালান রোধ এবং ব্যাগেজ ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। এর আওতায়, স্বর্ণ আমদানির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হচ্ছে।
এনবিআর আগামীদিনে রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়ায় আরও প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, বিশেষ করে এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) ব্যবহার করে কর ফাঁকি চিহ্নিতকরণ এবং মুছে ফেলার কাজে সহায়তা করা হবে।
এনবিআর এখন তার সংগ্রহ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। রাজস্ব আদায়ে গতি আনতে এবং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে এনবিআর ইতোমধ্যেই সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানাচ্ছে, যদি সব পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়, তবে পরবর্তী সময়ে রাজস্ব আদায়ের গতি দ্রুত হবে এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফলতা আসবে।
তবে, বর্তমান রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি এবং অতীতের রাজস্ব ঘাটতি হিসাব করে বলা যায়, এবারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বেশ চ্যালেঞ্জিং। অতীতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অনেক সময় সংশোধিত বাজেটে কমানো হলেও, সেগুলি পূরণ করা যায়নি, যার কারণে বর্তমানে এক কঠিন লক্ষ্য সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।