মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৪৫ পূর্বাহ্ন
নিউজ ডেস্ক, নেত্রকোণার আলো ডটকম:
যে পৈতৃক ভিটায় ছয় ভাইয়ের শৈশব-কৈশোর কেটেছে একসঙ্গে, সেই ভিটারই সামান্য সীমানা নির্ধারণকে কেন্দ্র করে ঘটে গেল রক্তক্ষয়ী এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। নেত্রকোণার বারহাট্টা উপজেলায় বসতবাড়ির সীমানা বিরোধের জেরে বড় ভাইয়ের লাঠির আঘাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন ছোট ভাই সাইকুল ইসলাম (৩৫)। ভাইয়ে-ভাইয়ে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহতের স্ত্রী ও ১৫ বছর বয়সী কিশোরী মেয়েও গুরুতর আহত হয়েছেন।
সোমবার (২ নভেম্বর) ভোর সাড়ে চারটার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সাইকুল ইসলাম। এর আগে গতকাল রবিবার বিকেলে উপজেলার সিংধা ইউনিয়নের চন্দ্রপুর গ্রামে এ বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটে। নিহত সাইকুল ইসলাম ওই গ্রামের মৃত আব্দুল খালেকের ছোট ছেলে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মৃত আব্দুল খালেকের ছয় ছেলের মধ্যে জীবিকার তাগিদে তিনজন ঢাকায়, একজন প্রবাসে এবং একজন বারহাট্টা শহরে বসবাস করেন। কেবল ছোট ভাই সাইকুল ইসলামই বাবার ভিটা আঁকড়ে ধরে গ্রামে থাকতেন এবং কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন। কয়েক দিন আগে ঢাকা থেকে কাজের ফাঁকে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসেন বড় ভাই সাইদুর রহমান। বাড়িতে এসেই তিনি নিজের অংশের সীমানা নির্ধারণ এবং সেখানে দেয়াল তোলার উদ্যোগ নেন।
রবিবার বিকেলে সীমানা নির্ধারণকে কেন্দ্র করে দুই ভাইয়ের মধ্যে প্রথমে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে বাকবিতণ্ডা তীব্র রূপ নিলে সাইদুর রহমান, তার স্ত্রী ও ছেলে দেশীয় লাঠিসোঁটা নিয়ে সাইকুলের ওপর চড়াও হন। বড় ভাইয়ের এলোপাতাড়ি লাঠির আঘাতে সাইকুলের মাথা থেঁতলে যায় এবং তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এ সময় স্বামীকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে সাইকুলের স্ত্রী ও কিশোরী মেয়েকেও পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়।
পরে তাদের আর্তচিৎকারে স্থানীয় লোকজন ছুটে এসে রক্তাক্ত অবস্থায় তিনজনকে উদ্ধার করে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করান। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে আজ ভোরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন সাইকুল। তবে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তার স্ত্রী ও মেয়ের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত বলে চিকিৎসকদের বরাতে জানা গেছে। ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত বড় ভাই সাইদুর রহমান সপরিবারে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন।
এমন হৃদয়বিদারক ঘটনায় পুরো চন্দ্রপুর গ্রামে শোক ও ক্ষোভের ছায়া নেমে এসেছে। সিংধা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাসিম তালুকদার গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “খবর পেয়েই আমি ওই বাড়িতে ছুটে গিয়েছিলাম। ছয় ভাইয়ের মধ্যে কেবল সাইকুলই গ্রামে থেকে কৃষিকাজ করত। সামান্য একটু জায়গার সীমানা নিয়ে আপন ভাইদের মধ্যে এমন হানাহানি ও একটি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়া সত্যিই অত্যন্ত মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক।”
বারহাট্টা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চম্পক দাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
ওসি আরও জানান, এ ঘটনায় আজ (সোমবার) দুপুরে নিহত সাইকুলের স্ত্রী বাদী হয়ে বড় ভাই সাইদুর রহমান, তার স্ত্রী ও ছেলের বিরুদ্ধে থানায় একটি লিখিত হত্যা মামলার এজাহার দায়ের করেছেন। পলাতক অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।